সুনামগঞ্জ জেলা প্রকৃতিগত ভাবেই প্রবাহিত নদী, বিল, হাওর, বাওরে পরিপূর্ণ।সুনামগঞ্জের হাওর বেষ্টিত জামালগঞ্জ উপজেলায় বেশীরভাগ মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে সময়ের বিবর্তনে এলাকার জেলেরা জীবিকার প্রয়োজনে বংশানুগত মাছ ধরার পেশা ছেড়ে ঝুঁকছেন অন্য পেশায়।
একদিকে মৎস্য সম্পদ হ্রাস, অন্যদিকে হাওর বাওর ইজারাদার ও প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় তারা এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ পৈতিৃক ভিটা মাটি বিক্রি করে বস্তিতে থেকে গার্মেন্টস অথবা শ্রমিকের কাজ করছেন।
বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের মাঠ-ঘাট, পথ জলমগ্ন হয়ে পড়ে। প্রকৃতিগত কারণেই নদী তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মৎস্যজীবীদের আবাস। এ অঞ্চলে পেশাগত ভাবে ছোট ও মাঝারী কৃষক ও ক্ষেত মজুর মানুষই সংখ্যাগরিষ্ট। এসব কৃষক ক্ষেতমজুর এবং দিনমজুর সহ খেটে খাওয়া মানুষ সারা বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।
এরসাথে শুকনা মৌসুমে বোরো ধান আবাদ করেন। এ অঞ্চলে প্রচুর মাছের উৎপাদন হওয়ায় এক সময় হাওরাঞ্চলকে দেশের মৎস্য ভান্ডার বলা হতো। এখানে উৎপাদিত মাছের ৮০ভাগ দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং বিদেশে রপ্তানী হয়ে থাকে। ফলে বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনেও এ অঞ্চলের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। এই অঞ্চলের নদী ও জলমহালগুলোতে ধরা পড়ে রুই, কাতলা, আইড়, বোয়াল, চিংড়ি ইত্যাদি মাছ, যা ফারিয়া বা পাইকাররা কিনে ভৈরব, কুলিয়ারচর, সুনামগঞ্জ, ঢাকা, নিয়ে কেউ কেউ প্যাকেট জাত করে বিদেশেও রপ্তানী করেন।
এবং এঅঞ্চলের জলমহালগুলো এখন ইজারাদার এবং প্রভাবশালী উচ্চ পদস্ত রাজনৈতিক নেতা ও আমলাদের দখলে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর এসব জলমহাল ইজারা দেওয়া হয়।
মৎস্যজীবীরা জানান, “জলমহালগুলো মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ইজারা পাওয়ার বিধান থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নামে বেনামে এসব জলমহাল ইজারা নিয়ে থাকে।”
উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের মৎস্যজীবী জয়কিশোর দাস জানিয়েছেন, “প্রকৃত মৎস্যজীবী সমিতিতে ইজারা নেওয়ার পুঁজি না থাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ইজারাদাররা অমৎস্যজীবীদের সদস্য করে সমিতি রেজিষ্ট্রেশন করে এসব জল মহাল ইজারা নিয়ে থাকে। ”
তিনি আরও বলেন, “ইজারা নেওয়ার পরই জলমহালগুলো প্রভাবশালীরা নিজেদের দখলে নিয়ে প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দেয়। তারা বেশির ভাগই ইজারাদার নদীর মাঝে বাঁধ দিয়ে ঘের তৈরী করে বিভিন্ন জালে মাছ ধরে কোটি কোটি টাকা লাভবান হচ্ছেন।”
একই গ্রামের যুবরাজ দাস, বিশ্বজিৎ দাস, অরবিন্দ দাস ও নিখিল দাস জানিয়েছেন, “এলাকার প্রভাবশালী সাহেব বাবুরা আমরার জাতে নাম লেখাইয়া সমবায় সমিতি কইরা আমরার রিজিক কাইড়া নিচ্ছে। আগে আমাদেরকে মৎস্যজীবী বলে হেয় করতো, এখন তারাই বড় মৎস্যজীবী হইয়া গেছে। যার কারণে বর্তমানে জলভরা মৌসুমে হাওরে কিংবা আবাদী জমিতেও ইজারাদাররা আমাদের মাছ মারতে দেয় না। আমাদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্যোগ।ফলে জেলেরা বাধ্য হয়েই বাপ দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।”
এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ জানান, “প্রকৃত নিয়মে মৎস্যজীবীরা সমিতি করে বিল বাদল নেওয়ার বিধান থাকলেও অনেকেই অর্থের অভাবে বিলগুলো নিতে পারছেন না। আবার অনেক অমৎস্যজীবীরাও মৎস্যজীবী হয়ে সমবায় সমিতির মাধ্যমে বিলগুলো ইজারা নিচ্ছে। এতে করে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা বঞ্চিত হওয়ায় তাদের জীবনে দুর্দিন নেমে এসেছে। যার কারণে অনেকেই তাদের পূর্বপুরুষদের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে।”
Leave a Reply